মার্কিনদের কাছে একযুগ আগেই গণভোটের প্রস্তাব করেছিলেন আলী রীয়াজ

মার্কিনদের কাছে একযুগ আগেই গণভোটের প্রস্তাব করেছিলেন আলী রীয়াজ

২০১৪ সালের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক অচলাবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু ছিল দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়কবিরোধী কঠোর অবস্থান দেশকে সহিংসতা, টানা অবরোধ ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাবকমিটির শুনানিতে অংশ নিয়ে একটি বিকল্প সমাধান তুলে ধরেন উড্রো উইলসন সেন্টারের তৎকালীন পাবলিক পলিসি স্কলার ড. আলী রীয়াজ। তিনি মত দেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নটি যেহেতু কখনো জনগণের ভোটে যায়নি, তাই সংসদ ভেঙে সংবিধানসম্মত যে ৯০ দিনের বর্ধিত সময় পাওয়া যাবে—সেই সময়ের মধ্যে বিষয়টি গণভোটে তোলা যেতে পারে। সে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতেই পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তার যুক্তি ছিল এ পথই সংকটাপন্ন পরিস্থিতি থেকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ উত্তরণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারাসহ আরো অনেকেই বাংলাদেশের প্রধান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করেছিল। একই ইস্যুতে বৈঠক করেছিল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সাবকমিটি। ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির এশিয়া ও প্যাসিফিক-বিষয়ক সাবকমিটির শুনানিতে এসব আলোচনা তুলে ধরেন ড. আলী রীয়াজ।


সাবকমিটির বৈঠকে উড্রো উইলসন সেন্টারের তৎকালীন পাবলিক পলিসি স্কলার আলী রীয়াজ তার স্টেটমেন্টে বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি হতে পারে। একটি হলো সব দলের অংশগ্রহণে একটি নিয়মিত নির্বাচন। তবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর আপসহীন অবস্থানের কারণে এটি ঘটার সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে বিরোধী দলের কিছু দাবি মেনে নেয়া। উদাহরণস্বরূপ নির্বাচনের সময় মন্ত্রিসভা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে না থাকা।’

এছাড়া আসন্ন নির্বাচন বিরোধী দল বর্জন করবে বলেও মত দিয়েছিলেন তিনি। আলী রীয়াজ বলেন, ‘এ পরিস্থিতি ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির মতো। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ক্ষমতাসীন দলের খুব কম মিত্রই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি ১৯৯৬ কিংবা ২০০৬ সালে ছিল না। যেখানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। একদিকে বিরোধী দল ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে সহিংস কৌশল অবলম্বন করেছে এবং অন্যদিকে সরকার বিরোধী দলকে দমন করার জন্য অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে এবং বিরোধী নেতাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।’

তৃতীয়ত, নির্বাচন স্থগিত করার কথাও জানান তিনি। আলী রীয়াজ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সাবকমিটিকে বলেন, ‘এটি বর্তমান সংবিধানের আওতায় অথবা পরবর্তী সংসদ কর্তৃক কার্যত অনুমোদনের জন্য সংবিধান-বহির্ভূত পদক্ষেপের মাধ্যমে করা যেতে পারে। ১২৩ (৩) (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে সংসদ ভেঙে দেয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সুতরাং যদি সংসদ ভেঙে দেয়া হয় তাহলে এ সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান করতে এ তিন মাসের সময়টি ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থগিতাদেশ/ছেদ বলে মনে হলেও এটি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বর্তমানের বৈরিতা কমানোর সুযোগ প্রদান করতে পারে।’

তিনি আরো জানিয়েছিলেন, ‘তিনটি সাংবিধানিক সংশোধনী হয়েছে। এর মধ্যে ১৩তম সংশোধনী এ ব্যবস্থাকে ফাঁকফোকরে ভরপুর করে তুলেছে। ১৪তম সংশোধনী একে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করেছে। ১৫তম সংশোধনী এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছে। কিন্তু এ তিনটির কোনোটি কখনো নাগরিকদের অনুমোদনের জন্য সামনে তোলা হয়নি, কোনো রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ প্রশ্নকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। তাই এক পথ হতে পারে সংসদ ভেঙে দেয়ার পর সংবিধান যে বর্ধিত সময়কাল অনুমোদন করবে, সে সময়ের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করা। ওই গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এতে সব রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনো মাত্রায় বিজয়ের অনুভূতি পাবে এবং বর্তমান অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ তৈরি হবে।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয় উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, ‘যেহেতু প্রতি পাঁচ বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় তাই নির্বাচনের ওপর মনোযোগ দেয়ার পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গণতন্ত্রের মানে জোর দেয়া। টেকসই ও মানসম্পন্ন গণতন্ত্রের জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। যেমন একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়াসহ অন্যান্য বিষয় থাকবে।’

এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওই বিশেষ পরিস্থিতিতে আমার কাছে মনে হয়েছিল যে গণভোটের মধ্য দিয়ে এটি নিষ্পত্তি করা যায়। আমার যতদূর মনে পড়ে ওই লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলেও গণভোট করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। সরকার চাইলে একটি গণভোট করার মধ্য দিয়ে এটার নিষ্পত্তি করতে পারে। কিন্তু আমরা তো জানি গণভোট কেন কোনোভাবেই এটি নিষ্পত্তি করার ইচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনটি সাজানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমার কাছে যেটি মনে হয় যে সাংবিধানিক বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার জন্য গণভোটই হচ্ছে জনগণকে অংশগ্রহণ করানোর একটি উপায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টের শেষেও আমি এটিই বলেছিলাম। রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মধ্য দিয়ে সেটি এসেছে এবং সেভাবেই সরকার একটি গণভোটের আয়োজন করেছে। সুতরাং গণভোটের এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যদি সব জনগণের সুষ্ঠুভাবে মতামত নিতে পারি তাহলে আমরা বিশ্বাস করি জনগণের মধ্যে সংস্কারের সমর্থন আছে। গণভোটে তারা তাদের রায়টি দিতে পারবে।’

News Courtesy:

Bonik Barta | January 8, 2026

 

 

An unhandled error has occurred. Reload 🗙