← Back
Media Reports

রাষ্ট্রসংস্কারে ‘ধীর গতি’: সরকারকে কতটা চাপে রাখতে পারবে বিরোধী জোট?

📅 August 05, 2026 ✍️ Ali Riaz
রাষ্ট্রসংস্কারে ‘ধীর গতি’: সরকারকে কতটা চাপে রাখতে পারবে বিরোধী জোট?
“সংস্কার কেবলমাত্র কিছু অনুচ্ছেদের পরিবর্তন নয়, এটা কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে,” বলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সালমান তারেক শাকিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

রাজপথের যে ঐক্য অভূতপূর্ব এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে, সেই ঐক্য কী অটুট আছে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পর রাষ্ট্রসংস্কারের ঐকমত্যের দলিল জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য কী আছে?

গেল কয়েক দিনের রাজনৈতিক চালচিত্রের প্রেক্ষাপটে ৫ অগাস্ট অভ্যুত্থানের বার্ষিকীকে সামনে রেখে সেই প্রশ্ন ওঠেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরুতে হোঁচট খায়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির বিজয়ীরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ীরা দুই পদেই শপথ নেন।

গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধীদের মাঠের আন্দোলনের মধ্যেই বিএনপি সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে, যেখানে প্রতিনিধি দেয়নি বিরোধীরা।

ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ আবারো ক্ষমতায় এসে সংশোধনী বাতিল করে দেবে, এমন আশঙ্কা থেকে তারা সংবিধান সংস্কার নিয়ে তাদের দাবি আদায়ে রাজপথে নামার কথা বলেছে জামায়াত জোট।

অন্যদিকে বিএনপিও মনে করছে, বিরোধী দল ফাঁকা মাঠ ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তারাও মাঠে থাকার কথা বলেছে।

এ অবস্থায় বিরোধীরা আসলে কতটা চাপে রাখতে পারবে সরকারকে? এই আলোচনা যেমন জনপরিসরে আছে, তেমনি সংসদের বিতর্ক মাঠের রাজনীতিতে সংঘাতে রূপ নেবে কিনা, সেই আলোচনাও আছে।

সরকারি দল বিএনপি বলছে, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির মাধ্যমেই সংবিধানে অষ্টাদশ সংশোধনী আসবে। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবে তারা।

কত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন হবে, এ নিয়ে অবশ্য সরকারপক্ষের কোনো ‘রোডম্যাপের’ কথা জানা যায়নি।

মঙ্গলবার সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম বৈঠকের পর কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা সমঝোতার ভিত্তিতে সংশোধনী গ্রহণ করতে চান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, জুলাই সনদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দলিল বাস্তবায়নে সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে রাজপথে আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান মনে করেন, সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনীতি ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে।

সোমবার এক সেমিনারে তিনি বলেন, “এই রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থান ধীর গতির এবং দীর্ঘমেয়াদী।”

“জামায়াতে ইসলামীর কৌশল অপেক্ষা করার এবং এনসিপির অবস্থান রক্ষণাত্মক।”

ঐকমত্যের শুরুতেই সংশয়?

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের তিন দিন পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। মাস দুযেক পরেই রাষ্ট্র সংস্কারে উদ্যোগী হয় সেই সরকার।

সে বছর অক্টোবরে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এছাড়া পরে আরো ছয়টি কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।

কমিশনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিতে মুহাম্মদ ইউনূস নিজে সভাপতি ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রীয়াজকে সহ-সভাপতি করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন।

ঐকমত্য কমিশনের প্রথম আলোচনা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মাধ্যমে শুরু হওয়ার কারণে বিএনপিতে প্রথম সংশয় তৈরি হয় বলে দলের স্থায়ী কমিটির অন্তত দুইজন সদস্য এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের নিযুক্ত কেন্দ্রীয় একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন।

তারা বলেছেন, এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের সময় সংস্কার আলোচনা শুরু হয়েছিল তখনকার বিএনপি ভেঙে গড়ে ওঠা বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীকে দিয়ে; অন্তর্বর্তী সরকার করেছিল বিএনপি ছেড়ে যাওয়া অলি আহমদকে দিয়ে।

তারা বলেছেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির বাইরে গিয়ে এভাবে একটি বড় রাজনৈতিক সংস্কারের ভবিষ্যত নিয়ে সেজন্য শুরুতেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে পাঁচটি কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে পাঠানোর পর ৩৩টি দলের সঙ্গে ৭২টি বৈঠক করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ওই পর্ব শেষে ঐকমত্য ও ভিন্নমতযোগে ৮৬টি সুপারিশ রেখে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করে।

ঐকমত্য কমিশনের এই সনদ প্রণয়নের শুরু থেকেই শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে যুক্ত থাকা প্রধান তিন রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে ‘বিরোধ’ সৃষ্টি হয়। তখনো অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দল প্রকাশ্যে আসেনি, যাদের কার্যক্রম চলছিল জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে।

জুলাই সনদ প্রণয়নের সেই আলোচনায় জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ১৯৭২ সালের সংবিধান পুরোপুরি বাতিলের দাবি করে। তারা গণপরিষদ গঠন করে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের আহ্বান জানায়।

পরবর্বর্তী সময়ে জুলাই সনদ স্বাক্ষর, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্ন মত অন্তর্ভুক্ত না করা নিয়ে বিতর্ক ও গণভোটের সময় নিয়ে বিরোধ জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দলগুলোকে দুই মেরুতে ঠেলে দেয়।

এ দুই মেরুর এক দিকে বিএনপি ও তার যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা, অন্যদিকে জামায়াতেই ইসলামীর মিত্ররা, যাদের মধ্যে অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি অন্যতম।

গেল ২৮ জুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে পরিচিতি মুখ ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “হ্যাঁ, আমরা নির্বাচনের স্বার্থে জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করে জুলাই সনদে সবাই মিলে আমরা সমঝোতায় এসেছি। এবং আমরা স্বাক্ষর করেছি।

“হয়তো আমরা ওই সমস্ত পয়েন্টে একমত নাও হতে পারতাম, কিন্তু জাতির স্বার্থে আমরা সেটা আপস করেছি।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের অন্তত তিনজন নেতা বলেছেন, ঐকমত্য কমিশনের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা চেয়েছিলেন আগে গণভোট করে অন্তবর্তী সরকারের ক্ষমতায় থাকার সময় দীর্ঘায়িত করা। এটি বিএনপি টের পেয়েই নির্বাচনের জন্য মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘চেপে’ ধরে।

তবে অন্তবর্তী সরকারের নির্বাচন পেছানোর কোনো পরিকল্পনা বা ‘চিন্তা ছিল না’ বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্য।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গণভোট আগে করে সরকার দীর্ঘায়িত করারও চিন্তা ছিল না। বরঞ্চ বিএনপি সংস্কার কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে বাইরে এসে ভিন্ন কথা বলেছে।”

ঐকমত্যের দরবারেই মতবিরোধ

জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের অবস্থান ছিল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে (পিআর) নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। দলটি সংসদের নিম্নকক্ষের ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে নির্বাচনের জন্য সক্রিয় ছিল তারা। এর বিরুদ্ধে ছিল বিএনপি।

বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই সংবিধান পুরোপুরি বাতিলের প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়। তাদের ৩১ দফার ভিত্তিতে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের দাবিতে অনড় থাকে।

কমিশনের সংলাপে বিএনপির নেতারা তখন সরকারকে নির্বাচনের দিকে মনোযোগী হতে পরামর্শ দেন। পাশাপাশি যেসব বিষয়ে সর্বসম্মতি তৈরি হবে সেগুলো বাদে বাকি বিষয়ে জনগণের কাছে উপস্থাপনের কথা বলেছিলেন তারা।

অনেক বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও কয়েকটিতে এই দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি, গুম ও জুলাই গণহত্যায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, পর-পর একই ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

অধ্যাদেশ নিয়ে হতাশা, মাঠে বিরোধী দল

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এসব অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১২ মার্চ জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি করে ১৩ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

পরে ১৫ মার্চ আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবে সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কমিটিতে পাঠায়।

এসব অধ্যাদেশের মধ্যে গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ২০টিকে আইনে রূপ না দেওয়ার সুপারিশ করে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।

এগুলোর মধ্যে চারটি রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য প্রস্তাব করা হয়। সেগুলো হচ্ছে, জাতীয় সংসদ সচিবালয় অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ।

বিএনপির একজন সংসদ সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্তবর্তী সরকারের সবচেয়ে আগ্রহের তালিকায় ছিল বিচার বিভাগ সম্পর্কিত অধ্যাদেশটি। আর এ কারণেই বিএনপি সরকার বিষয়টিকে মনোযোগে নিয়েছিল।”

তিনি বলেন, “জুলাই সনদে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএনপি এই প্রস্তাবে ভিন্ন মত দিয়ে জ্যেষ্ঠতম দুইজন থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি করার প্রস্তাব দিয়েছিল। যে কারণে এটা বাতিল করেছে ক্ষমতায় এসে।”

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন জুডিশিয়াল অ্যাপয়েনমেন্ট কমিশন গঠনের কথা সনদে থাকলেও বিএনপি এক্ষেত্রে ভিন্ন মত দিয়েছিল। তারা সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করবে।

এ সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব জুলাই সনদে থাকলেও বিএনপি ভিন্ন মত দেয়। অধ্যাদেশ বাতিল করায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থাপিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ও বিলুপ্ত হয়।

আর এসব অধ্যাদেশ বাতিলের জের ধরেই রাজপথে নামে বিরোধী দল জামায়াত। গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করায় প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।

 

মাঠে থাকবে জামায়াত জোট?

জোটের শীর্ষস্থানীয় অন্তত পাঁচজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় থাকবেন। এই দাবি থেকে দূরে থাকা জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য দলের সুযোগ নেই।

জোটের দুই জন শীর্ষস্থানীয় নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, বিএনপির পুরো আন্তরিকতা না থাকলে সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পাশাপাশি এই দাবির পক্ষে জনগণ খুব দ্রুতই বিরোধীদের ডাকে সাড়া দেবে, এমনটিও মনে করছেন না তারা।

সোমবার রাতে জামায়াত জোটের বৈঠকেও সনদ বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ দাবিতে নিয়মিত কর্মসূচি রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন জোটের শীর্ষনেতারা।

বৈঠকে জোটের শীর্ষনেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে দুই নেতা বলেছেন।

জোটের একজন নেতা বলেন, ক্ষমতায় এসে বিএনপির আচরণ নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ।

জানতে চাইলে জোটের অন্যতম নেতা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, “জুলাই সনদ নিয়ে সমঝোতা করার কোনো সুযোগ নাই। আমরা সম্মিলিতভাবে ১১ দলের এবং বাইরের অনেক দলই জুলাই সনদের পক্ষে, এখান থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নাই।”

জোটের একটি শরিক দলের প্রধানের পর্যবেক্ষণ, “জামায়াত শক্তভাবে চাইবে না, কিন্তু নড়তেও পারবে না। এই দাবি থেকে জামায়াত, এনসিপি কারো পক্ষেই সরে যাওয়া সম্ভব না।

“আমরা কতটা জোর দিয়ে দাবি করব, আন্দোলন করব, এ নিয়ে মতদ্বৈততা থাকতে পারে, তবে দাবি থাকতেই হবে।”

জোটের সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জনগণ পথ দেখিয়েছে সরকারকে কোন পথে হাঁটতে হবে। আমরা নতুন কর্মসূচি ঠিক করেছি। অচিরেই সেগুলো প্রকাশ্যে আসবে।”

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে ‘গণআন্দোলন’ ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করেন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।

তিনি এও মনে করেন, আন্দোলনকে গণরূপ দিতে আরো অপেক্ষা করতে হবে।

এবি পার্টি প্রধান মঞ্জু বলেন, “সারাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি বিদ‍্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, গ‍্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও দ্রব্যমূল‍্যের উর্ধ্বমুখী চাপের বিরুদ্ধে সচেতনামূলক কর্মসূচি দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।কর্মসূচিতে জনমানুষকে সম্পৃক্ত করতে গণসংযোগ বাড়াতে হবে।”

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “সংসদে যেহেতু সমাধান হয়নি, তাই রাজপথেই সমাধান আসবে। বিরোধী দল রাজপথেই আছে।”

 

যেভাবে ঐক্যে ফাটল বাড়ছে

জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার দুই দিন আগে ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়।

সেদিন বিরোধী দল গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে এই কমিটি করার প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।

কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচ জন প্রতিনিধিকে রাখার কথা বলা হলেও জামায়াত, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো নাম প্রস্তাব করেনি।

এ বিষয়ে জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা সংবিধান সংশোধন কমিটির ধারণার সঙ্গে একমত নন। তাই কমিটিতে 

নামও তারা দেবেন না।

তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখনো বিরোধীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে স্বীকার করেন, তারা এখনো জামায়াতের অপেক্ষায় আছেন।

মঙ্গলবার কমিটির বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন বলেন, তারা আলোচনার মাধ্যমেই এই সংশোধনী আনবেন। এমনকি তারা আলোচনার জন্য বিশেষ কমিটিতে নাম না দেওয়া জামায়াতের সাড়া পাওয়ার অপেক্ষা করছেন।

সংবিধান সংশোধনে কমিটি হলেও বিরোধী দলের আশঙ্কা, সংবিধান সংশোধনের কার্যক্রম ‘প্রতারণা’। সংবিধান সংস্কার না করে কেবল সংশোধন করা হলে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো সরকার তা ‘বাতিল’ করে দিতে পারে।

জামায়াত জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদের মতে, সংবিধান সংশোধন টেকসই হয় না।

“এই সংশোধনী ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে; এটা আদালতে টিকবে না। পরে আরেকটা পার্টি ক্ষমতায় এসে বাতিল করে দেবে।”

এজন্য সরকারের উচিৎ ‘জনগণের দেখানো’ পথে হাঁটা, বলেন তিনি।

এনসিপির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আমরা তো সংশোধন নয়, সংস্কার চেয়েছি। আমরা চেয়েছি পদ্ধতিগত পরিবর্তন। রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকে বিএনপি এই পরিবর্তনের বিপক্ষে। তারা জবাবদিহিতে ভয় পায়।”

জোটের আরেক শরিক দলের নেতা মামুনুল হকের কথায়, “সরকারের সংবিধান সংশোধনীর প্রক্রিয়া সংস্কার কার্যক্রমকে বানচাল করার তৎপরতা। এটি রাজনৈতিকভাবেও প্রতারণামূলক।”

যদিও মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান সংশোধন করতে সবার সাথে আলোচনা করতে চান এবং এক্ষেত্রে তারা ‘উদার এবং ওপেন’।

 

বিএনপিও মাঠে থাকবে

ক্ষমতাসীন দলের স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা হয়নি।

তারা বলছেন, সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি ‘ধীর’ থাকবে। পাশাপাশি রাজপথেও থাকবে দলটি।

দুদিন আগে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ইঙ্গিত দিয়েছেন সরকারের আসন্ন আচরণ সম্পর্কে।

সংসদের পরিবর্তে রাজপথকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য ‘ইতিবাচক নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র, দেশ ও জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও পিছপা হবে না।”

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এটা তো সংবিধান সংশোধনের কাজ, ইতোমধ্যে বিশেষ কমিটি হয়েছে। আশা করছি জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে বিষয়টি উঠতে পারে।

সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বিএনপির মহাসচিব বলেন, “জুলাই সনদের বাস্তবায়নে বিএনপির আন্তরিকতা নিয়ে কথা উঠলে খুবই অপমানিত মনে হয়। আমাদের আন্তরিকতা কেমন, এটা বলা হলে আমরা অপমান বোধ করি।”

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই ইস্যুতে বিএনপিও নিয়মিত কর্মসূচিতে থাকবে। ইতোমধ্যে ছাত্রদলের কর্মসূচি চলছে। মঙ্গলবার বিএনপির পক্ষ থেকে আলোচনা সভাও হয়েছে, যাতে অংশ নেন দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের দাবি, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে বিএনপি জুলাই সনদের বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তমূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। এর আগে এই কেন্দ্রিক দলীয় কার্যক্রম থাকবে।

বিরোধী দলকে ফাঁকা মাঠে ছেড়ে দেওয়া হবে না, বলেন তিনি।

 

সনদের ‘গন্তব্য’ কোথায়?

জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে নতুন সরকারের উদ্যোগ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ তাদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, গণভোটের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটা সংস্কার চেয়েছে। সংস্কার কেবলমাত্র কিছু অনুচ্ছেদের পরিবর্তন নয়, এটা কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।

“যাতে করে ক্ষমতার বিন্যাস পরিবর্তন হয়; রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়; জবাবদিহি তৈরি হয়, এগুলো এতই পরস্পরসংশ্লিষ্ট যে এগুলো বড় আকারে সাংবিধানিক সংস্কার ছাড়া এই রাষ্ট্রকে একটা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিতে পারবেন না।”

এ বোধটা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছিল বলেই তো সংস্কারের কর্মসূচি ও প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে, এ কথা তুলে ধরে অধ্যাপক রীয়াজ বলেন, “ফলে এই জায়গাটায় আমাদের স্থির থাকা দরকার।”

 

অভ্যুত্থানে শহীদ রাকিবুলের বাবা আবু বকর সিদ্দিক মনে করেন, গত বছর ১৭ অক্টোবর সব দলের অংশগ্রহণে যে সনদ স্বাক্ষর হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে সব দল মিলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করবে বলে আশা করি।”

সংবিধান সংশোধনে বিএনপির নিজস্ব মতামতই প্রাধান্য পাবে বলে মনে করেন বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

তার মতে, সরকার কোনোভাবেই নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘার্ষিক হবে, এমন কিছু করবে না।

সাইফুল হক মনে করেন, জুলাই সনদের বিষয়ে জনগণের কাছ থেকে বিরোধী দলগুলো এখনই কোনো সাড়া পাবে না।

তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিশ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। একইসঙ্গে জাতীয় সংসদে অষ্টাদশ সংশোধনী যথাযথভাবে আনা হলে বিরোধীদের আন্দোলনের সুযোগ কম বলেই মনে করেন সাইফুল হক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক খালিদুর রহমান অবশ্য ‘রাজপথে উত্তাপের আশঙ্কা’ উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এই শিক্ষকের মতে, জুলাই সনদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দলিল বাস্তবায়নে সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক বিতর্ক রাজপথের আন্দোলনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, “তবে সরকার যদি সংলাপ, সংসদীয় বিতর্ক এবং জনমতের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, তাহলে মতপার্থক্য সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ নিতে পারে।

“যদি কোনো পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জাতীয় ঐকমত্যের পরিবর্তে অচলাবস্থা সৃষ্টি কিংবা একতরফা অবস্থানকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ঝুঁকি সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।”

তবে আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দেশের বড় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে জুলাই সনদ বাস্ততবায়ন হলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

গত বছর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক একজন সদস্য মনে করেন, “আওয়ামী লীগ ফিরলে জুলাই সনদকে মেনে নিয়েই রাজনীতি করতে হবে। বিশেষ করে বিরোধী দল হিসেবে দেশে রাজনৈতিক স্থিতি ও সরকারি নিপীড়নের বাইরে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সনদ সব দলকেই পথ দেখাবে।”

News Courtesy: bdnews24.com