← Back
Media Reports

রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ বন্ধ না হলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ কঠিন: আলী রীয়াজ

📅 October 05, 2026 ✍️ Ali Riaz
রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ বন্ধ না হলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ কঠিন: আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে আমলাতন্ত্র নিরপেক্ষ প্রশাসন হিসেবে না থেকে রাজনৈতিক প্রভুদের অধীনে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই কাঠামো পরিবর্তন করা না গেলে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কঠিন বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

রোববার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের দ্বিতীয় দিনে ‘দ্য অথরস টেবিল’ শীর্ষক সেশনে এসব কথা বলেন আলী রীয়াজ। ‘বাংলাদেশ কি চক্র ভাঙতে পারবে?’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের বাধা, রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে কথা বলেন।

 

সংবিধানের কাঠামো নিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান যেভাবে লেখা হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব রয়েছে। নিয়োগ রাষ্ট্রপতির নামে হলেও সংবিধানেই এর কাঠামো নির্ধারিত। এখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই।

তার মতে, এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করা না গেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কঠিন। নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বিচার বিভাগ এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিমাত্রায় রয়েছে। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন স্বাধীন না হলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ
বাংলাদেশের সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণকে উল্লেখ করেন আলী রীয়াজ। তার মতে, ১৯৯১ সালের পর বিভিন্ন সরকারের সময়ে এ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তবে ২০০৯ সালের পর রাষ্ট্রযন্ত্র সহজ ও সরলভাবেই একটি দলের যন্ত্রে পরিণত হয়।

আলী রীয়াজ বলেন, এই পরিস্থিতিকে শুধু ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের ইতিহাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মূল সমস্যা হলো রাষ্ট্রের রাজনীতিকীকরণ- যা একদিকে ক্ষমতাসীন দলের দিক থেকে হয়েছে, অন্যদিকে আমলাতন্ত্রের দিক থেকেও হয়েছে।

আমলাতন্ত্রের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমলারা আমলাতন্ত্র হিসেবে নয়, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক প্রভুদের সেবা করতেই বেশি পছন্দ করেন। গত ১৫-১৬ মাসের মধ্যে প্রায় নয় মাস তাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এ কথা বলছেন বলে জানান।

গণঅভ্যুত্থান এবং পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যানের পরও আমলাতন্ত্রের বড় অংশের মধ্যে পরিবর্তনের অনিচ্ছা দেখেছেন বলে মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। সংস্কার ঠেকাতে আমলারা নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

‘বাংলাদেশ চক্র ভাঙতে পারে’
বাংলাদেশ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এই চক্র ভাঙতে পারবে কি না, সে প্রশ্নে এখনই নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে মনে করেন আলী রীয়াজ। নিজেকে আশাবাদী উল্লেখ করে তিনি বলেন, আশাবাদী না হলে তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হতেন না।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও নয় মাস সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনো তারও পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন বলে জানান তিনি।

তবে এই পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সদিচ্ছা জরুরি বলে মনে করেন আলী রীয়াজ। তার ভাষ্য, বাংলাদেশ চক্র ভাঙতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিগুলো সত্যিই তা করতে চায় কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন।

জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে কয়েকটি ইঙ্গিতও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। এটি ছিল দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের প্রত্যাখ্যান। পরে রাজনৈতিক দলগুলো আবার সেই জায়গা দখল করেছে।

গণভোটের ফলাফলকেও জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেন আলী রীয়াজ। তার হিসাবে, পাঁচ কোটি মানুষ ‘হ্যাঁ’ এবং দুই কোটি মানুষ ‘না’ ভোট দিয়েছেন।

‘একই কাজ করে ভিন্ন ফল আশা করা যায় না’
একই কাজ বারবার করে ভিন্ন ফল আশা করা যায় না বলেও সতর্ক করেন আলী রীয়াজ। তার মতে, স্বৈরতন্ত্রের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করলে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, শেষ পর্যন্ত ফল একই দিকে গড়াতে পারে।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘খেলার নিয়ম’ পরিবর্তন না করলে একই কাজ আবারও করা হবে। ইতিমধ্যে সে রকম কিছু ইঙ্গিতও রয়েছে। এক বছর আগে তিনি লাল না হোক, অন্তত হলুদ পতাকা তুলে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসির সিনিয়র আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মাইকেল লিডাউয়ার এবং ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত। সেশন সঞ্চালনা করেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান।

 

Courtesy: https://samakal.com